Skip to main content

ঘরে ফেরার গান

Durgapuja-2017
বহু বছর পর এবার পূজোতে বাড়ি মানে বেলুন যেতে পারিনি।ভীষণ খারাপ লাগছিল।যদিও ভাই এর অকাল প্রয়াণে পূজোই গ্রামের বাড়ি যাওয়া আগের সে আনন্দ সে আবেগ সে আকুলতা আজ আর আসে না।বর ফাঁকা লাগে ।।
গ্রামে যেতে না পারাতে  আমার বৌউ এর কয়েকশো কান্নাকাটি হয়ে গেল।প্যাণ্ডেল ঘুরে পূজো দেখার অভ্যেস আমার নেই।তারওপর মৌসুমির শিরদাঁড়ায় চোট।সব মিলিয়ে পূজো প্রায় ঘরে বসে কাটলো।
"সপ্তমি অষ্টমী তিথি তুমি গত হয়ো না।কানছে রানি ধুলায় পড়ে প্রাণে বাঁচে না।বিজয়া দশমি তিথি তুমি গত হয়ো না।গৌরি গেল কৈলাসে সোম বৎসর আসবে না........ ।"
ভাসানের পরে এই গানের টান ছোটো ভাই মারা যাওয়ার পর আগের মতো আর অনুভব না করলেও এই গানের চিরন্তন এক আকর্ষণ আছে যা আমাকে আজও টানে।ছোটো থেকে বাবা  কাকার গলায় এই "চিরন্তনী" শুনে এসেছি।গৌরির বিদায়ের গান।চারদিনের আনন্দ মুখর দিনগুলি কাটিয়ে আমাদেরও ফেরারা গান।বৎসর কাল পরে গৌরি আবার আসবে এই আশা নিয়ে যে যার কর্মজীবনে ফিরে যাওয়ার গান।
প্রতিমা নিরঞ্জনের পর এটা ছিল আমাদের ঘরে ফেরার গান।সেই কোন কাল থেকে এক ভাবে চলে আসছে।ভাসান হয়ে গেলে কালি তলায় চলো।সেখানে কাঁচা হলুদ মুখে দেওয়া ও গেলা। কামড়ানো চলবে না।তারপর উপস্থিত গুরুজনদের সবাইকে প্রণাম করার ধূম।সমবয়সিদের সাথে কোলাকুলি।শেষে ঢাকের তালে তালে এই গান গাইতে গাইতে ভগবতী তলায় ফেরা।এই সেদিনও মনে হতো ভগবতীতলা যেন এখনি না আসে।গান যেন শেষ না হয়।গান শেষ হলে ভগবতী তলায় পৌঁছে গেলে মনে হতো সব শেষ।
বিভিন্ন সময় ছোটো কাকা, বাবা,লিচুকাকা ছিলেন সূত্র ধারক।মনপ্রাণ দিয়ে এই গানের বোল ধরতেন।তারা আজ আর কেউ নেই।
একবার প্রচণ্ডবৃষ্টিতে কালিতলা থেকে ভগবতী ঘর পর্য্যন্ত প্রচণ্ড কাদাময়।মামা, বড়দা, বাবুদা বাবা কাকারা সবাই একসঙ্গে গান গাইছে।হঠাত্ বাবুদা গেয়ে উঠলো "এই কানছে রানি কাদায় পড়ে প্রাণে বাঁচে না"।ধুলা হয়ে গেল কাদা।সে সব দিন কি ভোলার।সেই বুড়হ্যা কালিতলার ঘাট থেকে বোলপুখুরের পার দিয়ে, মিত্তি(মিত্র) তলার ভগবতী ঘর হয়ে,'মাহানঠাকরান আর দুর্গেশনন্দিনীর' নাছ(পাশের রাস্তা) দিয়ে গাইতে গাইতে আমাদের ভগবতী তলায় পৌঁছাতাম।উর্ধো বাহুতুলে সে নৃত্য আর গান - এক অনাবিল আনন্দে মন ভরে উঠতো।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা ঘাত প্রতিঘাতে মনের দ্বার আজ রুদ্ধ ।সেই আনন্দের অংশিদার আর হতে পারি না।
আমাদের প্রজন্মে হারু আমার ছোটো ভায় অরূপ এক নিষ্ঠ সূত্র ধারক ছিল।গ্রামের আরো অনেকের সঙ্গে আমার খুড়তুতো মামাতো ভাইবোন - সব একসঙ্গে সূত্র বা বোল ধারকের সঙ্গে গাইতাম আর আনন্দে নাচতাম করতালি দিতাম।
ভগবতী তলায় এসে গান শেষ হলে শান্তি জল নেওয়ার হুড়োহুড়ি।'আমার পড়েনি আমার পড়েনি',  বলে চিৎকার ।পুরুত মশাই, তিন কড়ি জ্যাঠা,শেষে হাঁড়ি উল্টে এক মাথা জল ঢেলে দিতেন কারো কারো মাথায়।তিন কড়িদাদুর ছেলে তামুদা একই ভাবে আনন্দ রসিকতায় এই ধারাবাহিকতা আজও ধরে রেখেছে।শান্তি জল পর্ব শেষ হলে শুরু হতো দিদার কাছ থেকে নাড়কেল নাড়ু আর বাতাসার প্রসাদের জন্য হুড়োহুড়ি কাড়াকাড়ি  -একবার পেলে হবে না।আবার চাই।প্রায় নারকেলবিহীনি নাড়কেল নাড়ু আর ভাঙা বাতাসা-তাই নিয়ে কাড়াকাড়ি।তখন ওটাই আমাদের কাছে ছিল 'মজামৃত'।
এরপর বাড়ির কালিতলায় প্রণাম সেরে বাড়ি ফেরা।মনটা একটা কি রকম দুঃখানন্দে ভরে উঠতো।বাড়ি ফিরে ধান-কলাই-সিঁদুর-টাকা-মাছ ছুঁয়ে গুরুজনদের প্রণাম করা।ঠাকুর দাদার ফটো দিয়ে প্রণাম শুরু হতো।
এই রীতি আজও চলে আসছে।আমার খুড়তুতো মেজদি,ভাষাদি, স্নেহ মায়া মমতা সব কিছু দিয়ে বাড়ির এই ট্রাডিশন ধরে রেখেছে।

Comments

Popular posts from this blog

বেলুন 2 - ক্যানেল পার

বহুস্মৃতি বিজড়িত ক্যানেল পারের স্যাঁকো। কালের ছোবলে এখন জরাগ্রস্ত ।একসময় সুন্দর সবল ছিল এই সাঁকো।এখন বার্ধক্যে এসে কোন রকমে গরুর গাড়ির ভার বহন করে।মনে হয় ভেঙে না পড়া পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে না।ক্যানেল অফিসের অবস্থা আরো শোচনীয় ।ছোটো বেলায় দেখেছি কি সুন্দর ছিম-ছাম সাজানো গোছানো ক্যনেল অফিস।সংলগ্ন বাগান ভর্তি নানা ফুল।দেবদারু ও আরও নানা রকম গাছ গাছালি।আলো-আধাঁরি পরিবেশ।সন্ধ্যায় নানা ধরণের পাখীর কিচির মিচির। সরস্বতী পূজোর ভোরে ক্যানেল অফিসের দারোয়ানকে ফাঁকি দিয়ে ফুল চুরি ও দেবদারু গাছের শাখা-পল্লব চুরি করা আমাদের কাছে এক বিশাল রোমাঞ্চকর বিষয় ছিল।অনেকটা রাজ্য জয় করার মতো।আমরা ভাবতাম দারোয়ান দেখেনি।আসলে সে দেখেও না দেখার ভান করত। অফিসের দক্ষিণ পশ্চিমে ছিল ওভারসিয়ার বাংলো।তার এক ধারে ষ্টাফেদের থাকার জায়গা ।লক গেট মেনটেনেন্স ও ক্যানেলের দেখভাল করতেন এনারা।চারিদিক কলকাকলী আর প্রাণ প্রচুর্যে ভরপুর ছিল। ক্যানেল অফিসার সামনের মেঠো রাস্তা।রাস্তাটা পূব দিকে গিয়ে যেখানে দু ভাগ হয়েছে ঠিক তার উল্টোদিকে ফুলদানির মতো দেখতে বিশাল পেকুর( অশ্বত্থ ')গাছদানি'টার ঠিক নীচে মা রক্...

বেলুন 4 - দাদু বড়বাবু

গ্রামে যেতে হলে কুরুম গ্রামে নামতে হতো।কুমার ডুবি ষ্টেশনে কোলফিল্ডে উঠে অণ্ডালে নামতাম।তার পর অণ্ডাল-সাঁইথিয়া ট্রেনে চেপে বাউল গান শুনতে শুনতে পৌঁছে যেতাম সাঁইথে।সেখান থেকে বারুণি প্যাসেঞ্জারে চেপে রামপুরহাট ।কখন কখন দেরি হলে দানাপুর এক্সপ্রেস।আমরা মনে প্রাণে চাইতাম দেরি হোক।দানাপুর এক্সপ্রেসের বিশাল কানাডা ইঞ্জনের প্রতি ছিল এক দুর্বার রোমাঞ্চকর আকর্ষণ যা আজও যায় নি।রামপুরহাটে নামতাম।পথে কখন মদন মামা বা বাবার বন্ধুবান্ধব সহযাত্রী হয়ে যেত।সবাই গ্রামে ফিরছে।চারদিক আনন্দে মশগুল, গল্পগুজব চল রামপুরহাট -সর্ধা-বুজুং বাসে চেপে আমরা সবাই কুরুমগ্রামে নামতাম -সরকার বা স্কুল পাড়া বা নিমতলা বা শিবতলা কোন এক জায়গায় নেমে পড়লেই হতো।নিতা কাকা,জিতু কাকা, মানিক মামারা অপেক্ষা করতো আমাদের জন্য।নামা মাত্র জিনিস পত্র সানন্দে কাঁধে মাথায় তুলে নিত।কেউ বলতো,"ভাইপোরা এল্যা"। কেউ বা বলতো, " ভাগনারা আসা হলো তবে"। আমরা তো ওদের দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠতাম।ওরাও ভীষণ খুশি আমাদের দেখে।অদ্ভুত এক একাত্মতা অনুভব করতাম যা আজও মন থেকে মুছে যায় নি।নিতা কাকা, মানিক মামারা আজ আর নেই।কিন্তু ওদে...

বেলুন 5 - কলাবাড়ি পুকুরটা

সম্প্রতি আমার বন্ধুবর লেখক কিশোর ঘোষালের 'বিন সুতোর মালা' পড়ছিলাম।বিভোর হয়ে পড়তে পড়তে হঠাতি কখন চলে গেছিলাম আমার কৈশোরে, আমার গ্রামে।সেই কলাবাড়ির পার।পার দিয়ে ডাঙা।পারে কলা গাছ, বাঁশ গাছের ঝোপ,  তালগাছ, আম গাছ, খেজুর ও আতা গাছে সারি।উত্তর পারে মাঝ বরাবর একটা শেওড়া গাছ।ভুত থাকে বলে সন্ধ্যাবেলায় আমরা ঐ গাছটার ধারে কাছে ভিড়তাম না।উত্তর পূব পারে একটু তফাতে আমাদের চণ্ডীমণ্ডপ ও পাশে গ্রামের বহু পুরনো বহু স্মৃতি জড়িত ক্লাব। পুকুরের দক্ষিণ পূব কোনে ছিল ধনপতি হালদারের বাড়ি।পেশাছিল মাছধরা।ধনপতি কাকু অনেকদিন হল 'আগালছেন'(গত হয়েছেন)। কলাবাড়ি পুকুরটা ছিল শচিদাদুর।আমার বাবার কাকা।একসময় টলেটলে জল ছিল দাদুর এই পুকুরের।কত হাঁস খেলে বেড়াত।লোকে চান করত ।গম গম করত পুকুর ।মাঝে মধ্যে জল মেরে পুকুর পরিস্কার করা হত।শচিদাদু অনেক দিন হল চলে গেছেন।পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন।খুব ভালো কুষ্টি লিখতেন।কালাবাড়ির পশ্চিমপারে ছিল আমাদের বাড়ি।পুকুরের দিকে পূব ধারে ছিল একটা খিড়কি।খিড়কিটা আজও  আছে।খিড়কির ধারে পুকুর আর পাড়ার মধ্যে রাস্তা -লোকে ভাবে নিজের।এই পুকুরে দুপুরে ছিপ নিয়ে বসা ছিল আমাদের প্রা...